মানবেতন জীবনযাপন করছেন হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ

দিনের শুরুতেই বাড়ির চারপাশটা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন দেখতে কার না ভালো লাগে। কিন্তু যারা দিনের পর দিন আমাদের এমন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখার সুযোগ করে দিচ্ছেন তারাই বেশিরভাগ সময় রয়ে যাচ্ছে না দেখা হয়ে। করোনা মহামারীতেও কি তাদের উপর নজর পড়েছিলো কারো? সম্মুখ যোদ্ধা হিসাবে পুলিশ, ডাক্তার, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার কথা বার বার উঠে আসলেও এই সব পরিচ্ছন্ন কর্মীদের কথা কতবার বলা হয়েছে বলুন তো? 

তাদেরও কিন্তু পুলিশ, ডাক্তারদের মত উপায় ছিলো না ঘরে বসে থাকার।

পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ যদি না করি, তাহলে তো আমাদের জীবন যাপন করতে পারবো না। অফিস আদালত, পৌর, রাস্তা-ঘাট, এসব পরিস্কার করতেই হবে।

দেশের অন্যান্য জায়গার মত গাইবান্ধাতেও রয়েছে হরিজন সম্প্রদায়ের বসবাস। যারা কাজ করেন পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসাবে। এদের নেই কোন নিজস্ব ভিটা বাড়ি। সরকারের দেয়া জমির উপরে গাঁদাগাঁদি করে তাদের তাদের বসবাস। কিন্তু সেই জায়গাটিও বন্ধ, অস্বাস্থ্যকর নালার উপরে। সূর্য্য ওঠার আগে শুরু হয় হরিজন সম্প্রদায়ের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নের কাজ। নগরীর রাস্তা থেকে শুরু করে বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত বা হাসপাতাল সব জায়গার ময়লা পরিস্কার হয় তাদের হাতেই। শুধু তাদের হাতে পরিস্কার হয় না তাদের মনের ময়লা।

দিন শেষে কাজের খ্যান্ত দিয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েও তারা বাড়ির পাশের দোকানে বসে এককাপ চা খেতে পারে না। শুধু চায়ের দোকানেই না, সমাজের কোন জায়গাতেই তাদের কোন স্থান নেই। আমাদের সমাজের ভেতরেই আর একটা ভিন্ন সমাজ তাদের।

নিজের বাসাতেই চা খাই। অন্য কোথাও চা খাই না। হোটেলে বসে খাই না।

বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে গেলে তাকে ভর্তি নিতে চাই না। তারপরেও যদি জোড় করে ভর্তি করিয়েও দেই, তাহলে টিচাররা তাদের পেছনে পাঠিয়ে দেয়। আমরা টিচারদেরকে বলি, আমাদের বাচ্চা কি বাচ্চা না?

এই বৈষম্য ছোট বেলা থেকেই গেঁধে দেয়া হয় তাদের মাথায়। স্কুল থেকেই শুরু হয়ে যায় তাদের অবহেলা করা আর নিজেকে ছোট জাত ভাবার চিন্তাধারা।

গাইবান্ধা জেলার শিশু কিশোর মেলার সংগঠক মোছাঃ মাছুরা আক্তার বলেন, গাইবান্ধা জেলায় যত কিন্ডার গার্ডেন আছে বা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আছে, সেখানে তারা শোষিত বঞ্চিত। তারা বাচ্চাদের ব্রেঞ্চে বসতে দেয় না। মানে পেছনে বসতে হবে। তাদের পরীক্ষার খাতা নিজেদের দেখতে হয়। বলে যে, তুমি দেখ উত্তরটা আমি বলে দিচ্ছি, সঠিক হচ্ছে কিনা। বাচ্চাদের ভর্তি করতে গেলে আমাদের মিথ্যাচার করতে হয়। স্কুলে যদি আমরা বলি যে, আমরা হরিজন সম্প্রদায়ের তাহলে এদের ভর্তি নিচ্ছে না।

এমনকি করোনাকালেও এই শিশুদের মাফ নেই স্কুলের বেতনের তাগাদা থেকে।

গাইবান্ধা জেলার শিশু কিশোর মেলার সংগঠক মোছাঃ মাছুরা আক্তার আরো বলেন, এই যে ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি করার বিষয়ে আমাকে বলা হচ্ছে, আমি যে এইসব ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করেছি, তাদের যেন বেতন দিয়ে আসি। দেখেন কেমন চাপ এটা। এখন করোনা পরিস্থিতি চলছে তার মধ্যে আবার ফোন দিয়ে তারা টাকা চাচ্ছে, বেতন চাচ্ছে।

এসব অছুত মানুষগুলো সারা মাস কাজ করে যে বেতন পাই, তা দিয়ে দিন যাপনের কথা আপনি ভাবতেও পারবেন না।

যে বেতন পাই তাতে সংসার চালানো অনেক কষ্টকর হয়ে যায়। বেতন একদম কম। আমি বেতন পাই মাত্র ১৭০০ টাকা, কয়েকজন পাই ২২০০ টাকা।

করোনা কালে তারা বাইরে কাজ করার জন্য যে সুরক্ষা সামগ্রী পাননি তা নয়। কিন্তু তা যে তাদের জন্য যথেষ্ট ছিলো না, তাতে কোন দিধা নাই।

আমাদের মেয়র সাহেব আমাদেরকে হ্যান্ডগোল্বস দিয়েছে, মাস্ক দিয়েছে ২ বার। তার বেশি দেননি।

সরকারীভাবে তাদের জন্য যেসব সহযোগিতা এসেছে, সেটা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগন্য।

১ নং ওয়ার্ডে আমাদের এদিকে একবারও ঢোকে না। কোনদিনও দেখে না, কি সমস্যা আছে না আছে এসব। এমনকি আমাদেরকে যে দেখবে সেটাও দেখে না। ঐ যখন ভোটের সময় আসে, তখন ঢোকে।

করোনা কারণে ডিসি সাহেবের কাছে আবেদন করেছিলাম ২৫০০ টাকা জন্য। বলেছিলো বিকাশের মাধ্যমে দেবে। আমাদের সবার তালিকা করা ছিলো, কিন্তু তার মধ্যে কিছু লোক বিকাশের মাধ্যমে সেই টাকা পেয়েছে।

কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করেছেন এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর।

গাইবান্ধার অবলম্বনের নির্বাহী পরিচালক প্রবির চৌধুরী বলেন, হরিজন এবং রবিদাশ সম্প্রদায় পুরাটাই মিলিয়ে পরিবার প্রতি ১৫ কেজি চাল, চিনি, তেল, আটা, সাবান, একটি প্যাকেজ ছিলো।

এদিকে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে বলা হচ্ছে, সর্বোপরি ৩ বার দেয়া হয়েছে অর্থ সহায়তা।

গাইবান্ধা সদরের উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মোঃ নাসির উদ্দিন শাহ বলেন, করোনার কারণে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজ কল্যাণ পরিষদ থেকে সদর উপজেলায় প্রথমে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ৬০ জনের মাঝে বিতরণ করেছি। এর পরবর্তীতে ৬০ হাজার টাকা ৬০ জনের মাঝে বিরতণ করেছি।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক জেলা জুড়ে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করলেও পিছিয়ে পড়া হরিজন সম্পদ্রায়ের জন্য আলাদা কোন সহায়তার কথা জানান নি।

গাইবান্ধা জেলার জেলার প্রশাসক মোঃ আবদুল মতিন বলেন, অসহায় যারা ছিলো তাদেরকে ২৫০০ টাকা করে দেয়া হয়। এগুলো জেলার প্রায় ৭২ হাজার লোককে এই টাকা প্রদান করেছি। যেটা আমরা মনে করি সবাই পয়েছে।

বৈষম্য ও অবহেলায় পিছিয়ে থাকা এই সম্প্রদায়ের যেখানে স্বাভাবিক জীবনেই নেই স্বাস্থ সুরক্ষা, সেখানে করোনা মহামারীতে তারা খুব বেশি স্বাস্থ্য সচেতন হবে ভাবাটা ভুলই হবে। আর সরকারের সুনজরের পাশাপাশি আপনি আমি চিন্তা ধারার পরিবর্তন করে তাদের প্রতি স্বহৃদয় না হলে হইতো হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ কোনদিনও দেখতে পাবে না অধিকার নিয়ে এগিয়ে যাবার আশার আলো।

CCD Bangladesh © 2021 All Rights Reserved.