Thursday, 17 June 2021

আবারো প্রমাণ করলো তরুনরাই পারে অসহায় মানুষের জীবন পাল্টে দিতে

আমি হেদায়েতুল ইসলাম বাবু। গাইবান্ধায় “করোনায় তারুণ্য” সংগঠনের কর্মী হিসাবে কাজ করছি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য লকডাউন দেয়া হচ্ছিলো, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশেও লকডাউন শুরু হয়ে যায়।

যার রিক্সার চাকা ঘুরলে জীবনের চাকা ঘুরতো, যেই মানুষটা দিনমজুর, শ্রমজীবি, ঠিক সেই মানুষগুলো পড়ে গেলো চরম বিপাকে।

তখন আমরা ভাবছিলাম যে এই মানুষগুলোর জন্য কিছু করা দরকার। এমনই এক সময় আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে “করোনায় তারুণ্য” নামে একটি সংগঠনের সন্ধান পাই।

শুরুটা ছিলো এরকম, এখানে একটা চায়ের দোকান আছে, সেই চায়ের দোকানে হঠাৎ করে বসে কথা বলছিলাম যে কি করা যায় বা আমরা কি করতে পারি।

করোনায় তারুণ্য-এর সেচ্ছাসেবক চঞ্চল কুমার চক্রবর্তী বলেন, প্রথমতঃ আমরা আমাদের যার যার স্বাধ্য মত, যার কতটুকু সামর্থ, এটা নিয়ে আমরা কিছু ক্যাশ তৈরী করলাম। ক্যাশ তৈরী হবার পরে এলাকার যত বিত্ত¡বানদের তালিকা তৈরী করলাম এবং তাদের কাছে আমরা গেলাম। অর্থ, খাদ্যশস্য, শবজি, যার যতটুকু সামর্থ আছে তাই আমরা তাদের কাছ থেকে সাহায্য চাইলাম। এলাকার গরীব দুঃখী মানুষের জন্য আপনারা কিছু একটা আমাদের সহায়তা করেন।

একটা ফান্ড যখন গঠন হলো, তখন আমরা আবার এই এলাকার যে কয়জন তরুণ-যুবক মিলে কাজ শুরু করেছিলাম, তাদেরকে নিয়ে বসলাম। এই ফান্ড আমরা কি করে কাজে লাগাতে পারি।

করোনায় তারুণ্য-এর সেচ্ছাসেবক চঞ্চল কুমার চক্রবর্তী বলেন, প্রত্যেক পাড়ায় পাড়ায় আমরা গেলাম। একেবারেই গরিব-দুঃখী যারা ভিক্ষা করতো, ভ্যান চালাতো, মানুষের বাসা বাড়ীতে কাজ করে খেতো, তাদের লিস্ট আগে করলাম। তাদের লিস্ট করে প্রথমে ২৫ টি পরিবারকে সহায়তা দিয়ে শুরু করলাম।

এই মানুষগুলো তো আসলে ত্রাণ চাইনি, সাহায্য চাইনি। কিন্তু সেই মানুষগুলো সংকটে পড়েছে। তখন আমরা আমাদের কার্যক্রমের নাম দিয়েছি “মানবতার বাজার”।

একজন প্রতক্ষ্যদর্শী বলেন, তখন তো কাজ ছিলো না। মানুষ খুব দুর্ভোগের মধ্যে ছিলো, খুব বিপদগ্রস্থ ছিলো। সেই সময় মানুষ এসেছে। আমি দেখেছি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে চাল, ডাল ইত্যাদি নিয়ে গেছে। মানুষ উপকৃত হয়েছে।

গ্রহীতা হিসেবে একজন বলেন, আমি চুল কাটার কাজ করি। করোনার সময় দোকান বন্ধ ছিলো। “মানবতার বাজার” থেকে চাল, ডাল, ডিম, মরিচ ইত্যাদি যেটুকুই পেয়েছি, অনেক উপকার হয়েছে।

গ্রহীতা হিসেবে অন্য আরেকজন বলেন, আমিও একদিন এসে নিয়ে গেছি। আমার ছেলে পেয়েছে একদিন পর বা দুই দিন পর। প্রতিদিন তো একজনই পাবে না।

গাইবান্ধা সদরের রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ভাটপাড়া গোপালপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্কুলটা বন্ধ। ঐ স্কুলের একটা কক্ষ আমরা বেছে নিই এবং সেখানেই আমাদের স্টোর রুম সাজাই। নিত্য প্রয়োজনীয় যে সামগ্রী, সেগুলো আমরা সংগ্রহ করে স্টোর রুমে রেখে প্যাকেট করে আমাদের কর্মীরা। পরদিন সকালে প্রতিদিন ২৫ জন করে করে ডেকে দেয়া শুরু করি।

করোনায় তারুণ্য-এর সেচ্ছাসেবক রাজিয়া আক্তার রেনু বলেন, আমাদের বড় ভাইয়া এখানে কাজ করতো। মেয়েদের স্যানিট্যারি ন্যাপকিন দেয়ার জন্য গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায় দিয়ে আসার জন্যর আমাকে ডেকেছে। লকডাউনের সময় স্কুলের মেয়েরা স্কুলে যেতে পারতো না এবং দোকানপাঠ সবকিছু বন্ধ ছিলো। সেই কারণে আমরা সে সময় তাদের বাড়ীতে গিয়ে গিয়ে পৌছে দিয়ে এসেছি।

টাকার সমস্যা ছিলো, সেজন্য আমাকে দিতে চাইনি। “মানবতার বাজার” থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন পেয়েছি এবং ওটা পেয়ে আমার খুব উপকার হয়েছে।

দোকানপাঠ তো বন্ধ আর রাস্তা-ঘাটে তো যেতে পারিনা। তখন আমি কিভাবে কিনবো? তো ওরা (মানবতার বাজার) যখন দিয়ে আসলো, তখন তো আমার জন্য ভালোই হলো। আমার শারীরিক দিক থেকেও অনেক ভালো হয়েছে।

আমরা শুধু এই “মানবতার বাজার” থেকেই ঈদ সামগ্রী ও নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীও দেয়নি, এর পাশাপাশা কিন্তু মানুষকে সচেতন করেছি যে মাস্ক ব্যবহার করবেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন।

গাইবান্ধার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, “করোনায় তারুণ্য” তারা একটা “মানবতার বাজার” দিয়েছিলো। আর এই “মানবতার বাজার” থেকে মানুষকে সহায়তা করা হয়েছে। এবং সেখানে বিভিন্ন দানশীল ও বিত্ববান ব্যক্তিদের সহায়তায় এটা পরিচালিত হয়েছে।

এপ্রিল-মে এর মাঝামাঝি সময়টায় যখন এই অঞ্চলের শ্রমিকরা বসে আছে, বেকার, লকডাউন, কাজ-কর্ম বন্ধ, অন্যদিকে সুনামগঞ্জের হাওড়ে বা সিলেটের ঐ হাওড় অঞ্চলে ধান পাকা শুরু করেছে। তখন ভাবলাম যে, ঐ অঞ্চলে যখন শ্রমিকের সংকট তখন এই অঞ্চল থেকে শ্রমিক পাঠানো যায় কিনা।

গাইবান্ধার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, সুনামগঞ্জ সহ বিভিন্ন হাওড়ে করোনার জন্য শ্রমিকের সংকোট দেখা দেই। তখন আমাদেরকে নির্দেশনা দেয়া হলো যে লেবার পাঠানো যায় কিনা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ আমাদের যারা সংশ্লিষ্ট তাদের সাথে যোগাযোগ করে বাসে করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন ডিসিদের সাথে কথা বলে যেখানে চাহিদা ছিলো আমরা শ্রমিক প্রেরণ করেছি।

করোনার হানায় যখন মানুষ বিপর্যন্ত তখন সরকারী সহযোগিতা আমরা যতটুকু জেনেছি যে, স্থায়ীয় মেম্বার, চেয়ারম্যানরা যেটা বলেছে শতকরা ১০০ জন মানুষের জন্য যখন সহায়তা প্রয়োজন তখন তারা ৩ থেকে ৫ জন মানুষের হাতে সেটা পৌছে দিতে পেরেছে। একদম শুরুর দিকের কথা আমি বলছি। আমাদেরও তো দায়িত্ব আছে, আমাদেরও কর্তব্য আছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো দরকার। আমরা কিভাবে পাশে দাঁড়াতে পারি, সেই চিন্তা করে, সেই প্যান করে, মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা নেয়ার পর আমরা মনে করেছি যে, সরকারের পাশাপাশি আমরা যারা তরুণ আছি, আমাদেরও এই সংকটে বসে থাকলে চলবে না। এই সংকটে আমাদেরকেও ঝাঁপিয়ে পরতে হবে। আর আমরা যদি এই সংকটে নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখি তাহলে এই মানুষগুলোর সংকট কোনভাবেই সমাধান করা সম্ভব হবে না

CCD Bangladesh © 2021 All Rights Reserved.